মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সামরিক উত্তেজনা এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হলেই যে নামটি বিশেষভাবে উঠে আসে, তা হলো হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি একদিকে যেমন সামরিক শক্তি, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— হিজবুল্লাহ কোন দেশের সংগঠন? এর উত্তর সংক্ষিপ্তভাবে হলো: হিজবুল্লাহ লেবাননের এক শিয়া ইসলামি রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন। তবে এর ভূমিকা, প্রভাব, কাঠামো ও আদর্শ বুঝতে হলে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
হিজবুল্লাহর জন্ম: কোন দেশে ও কেন
হিজবুল্লাহর জন্ম লেবাননে হলেও এর উৎপত্তির পটভূমি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
১৯৮২ সালে ইসরায়েলের লেবানন আক্রমণের পর লেবাননের শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। তখন বিভিন্ন শিয়া সংগঠন একত্রিত হয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এর মধ্যেই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ কয়েকজন শিয়া নেতা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের পরামর্শে হিজবুল্লাহ গঠিত হয়।
সংগঠনটি মূলত ইসরায়েলি দখলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে এটি একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়।
“হিজবুল্লাহ” নামের অর্থ
“হিজবুল্লাহ” (حزب الله) আরবি শব্দ, যার অর্থ—
“আল্লাহর দল” বা “গডস পার্টি”।
নামের মধ্যেই সংগঠনটির আদর্শিক ভিত্তি স্পষ্ট—একটি ধর্মভিত্তিক প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে নিজেদের পরিচিত করানো।
লেবাননে হিজবুল্লাহর ভূমিকা
যদিও এটি একটি সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে শুরু হয়েছিল, বর্তমানে হিজবুল্লাহ লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী অংশ।
১. রাজনৈতিক দল
হিজবুল্লাহ লেবাননের পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রাখে।
তারা “মার্চ ৮” নামের রাজনৈতিক জোটের একটি প্রধান অংশ।
২. সামরিক বাহিনী
হিজবুল্লাহর সশস্ত্র শাখা—যাকে “ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স” বলা হয়—লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীগুলোর একটি। বহু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, হিজবুল্লাহ লেবাননের সরকারি সেনাবাহিনী থেকেও অধিক সুসংগঠিত ও শক্তিশালী।
৩. সামাজিক সেবা ও মানবিক কার্যক্রম
হিজবুল্লাহ শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক সংগঠন নয়; এটি হাসপাতাল, স্কুল, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রকল্পসহ ব্যাপক সামাজিক সেবা পরিচালনা করে।
এটি লেবাননের দরিদ্র ও শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।
হিজবুল্লাহর আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি
হিজবুল্লাহর আদর্শ মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো:
১. শিয়া ইসলামী আদর্শ
ইরানের ইসলামী বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত শিয়া তাত্ত্বিক কাঠামো অনুসরণ করে।
২. ইসরায়েলবিরোধী প্রতিরোধ
ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার উৎস মনে করে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে “মুক্তির সংগ্রাম” সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
৩. পশ্চিমা হস্তক্ষেপ-বিরোধিতা
হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতিকে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের প্রচেষ্টা বলে মনে করে এবং এর বিরোধিতা করে।
হিজবুল্লাহ কি শুধুই একটি লেবাননীয় সংগঠন?
যদিও এটি লেবাননের সংগঠন—সংবিধানিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে উভয় ক্ষেত্রেই—তবুও কিছু কারণে হিজবুল্লাহ শুধু লেবাননের সীমাবদ্ধ নয়:
১. ইরানের প্রভাব
হিজবুল্লাহকে সাধারণত ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র বা “প্রক্সি গ্রুপ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ইরান তাদেরকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
তবে হিজবুল্লাহ নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন বলে দাবি করে।
২. সিরিয়ায় সম্পৃক্ততা
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হিজবুল্লাহ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষ নিয়ে সশস্ত্রভাবে অংশ নেয়।
এটি প্রমাণ করে যে সংগঠনটি প্রভাব বিস্তার করেছে লেবাননের বাইরেও।
৩. আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শিয়া সংগঠনের সঙ্গে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যেমন—
- ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স
- ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী
এছাড়া ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাও বহুল আলোচিত।
হিজবুল্লাহ কেন আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত
হিজবুল্লাহকে অনেক দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আবার অনেক দেশ তাদের “বৈধ প্রতিরোধ আন্দোলন” বলে মনে করে।
যেসব দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন বলে
- যুক্তরাষ্ট্র
- যুক্তরাজ্য
- কানাডা
- জার্মানি
- নেদারল্যান্ডস
- কিছু উপসাগরীয় দেশ
যেসব দেশ সমর্থন করে বা নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়
- ইরান (প্রধান সমর্থক)
- সিরিয়া
- রাশিয়া
- লেবাননের বড় অংশের শিয়া জনগোষ্ঠী
এই বিভক্তির কারণ রাজনৈতিক অবস্থান, কৌশলগত স্বার্থ ও আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই।
হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি
হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন রয়েছে। এগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:
- উন্নত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা
- ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ কৌশল
- ড্রোন ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নত ব্যবহার
- বহু যোদ্ধার সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা (বিশেষত সিরিয়ায়)
হিজবুল্লাহর সামরিক ক্ষমতা লেবাননের ভেতরে একটি দ্বৈত নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি করেছে—একদিকে এটি জাতীয় নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
লেবাননের জনগণের মধ্যে হিজবুল্লাহর জনপ্রিয়তা
হিজবুল্লাহ লেবাননের শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়। কারণ:
- সামাজিক সেবা
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
- ইসরায়েলবিরোধী প্রতিরোধ
- রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব
তবে সুন্নি, খ্রিস্টান এবং ড্রুজ সম্প্রদায়ের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক কম। লেবাননের ভেতরে এটিকে “রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
হিজবুল্লাহ কোন দেশের সংগঠন—সংক্ষেপে
হিজবুল্লাহ মূলত লেবাননের সংগঠন।
এটি লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামরিক প্রেক্ষাপট এবং সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে এর আঞ্চলিক সংযোগ, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, সংগঠনটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক খেলায় একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপসংহার
“হিজবুল্লাহ কোন দেশের সংগঠন” প্রশ্নের সরল উত্তর—লেবানন।
কিন্তু এর প্রভাব, ভূমিকা এবং গুরুত্ব শুধুমাত্র লেবাননের সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি একটি আঞ্চলিক জোটের অংশ, যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হিজবুল্লাহ একদিকে অনেকের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামী, অন্যদিকে কারও কাছে সন্ত্রাসী সংগঠন।
এই দ্বৈত ধরণই হিজবুল্লাহকে এত বিতর্কিত, আলোচিত এবং প্রভাবশালী করে তুলেছে।
